বাংলা গল্প | Lockdown a Prem | Love Story | সম্পত সামাই | 2020

বাংলা গল্প : লকডাউনে প্রেম

লেখক- সম্পত সামাই

“আমি কিচ্ছু শুনতে চাই না। সাড়ে দশটার মধ্যে যদি না এসেছ তো তোমার একদিন কি আমার একদিন। ” বুনো বেড়াল এর মত গরগর করতে করতে বলল তিস্তা।
দুধে মিইয়ে যাওয়া বিস্কুটের মত গলায় বলার চেষ্টা করলাম,” একবার বোঝার চেষ্টা করো প্লিজ। সোনা আমার।”

মাঝে মাঝে মনে হয় তিস্তা আমার প্রেমিকা না আলজেব্রা ক্লাসের দিদিমনি যে কথায় কথায় এত শাসন করে! অন্য কেউ হলে এতদিনে নির্ঘাত পুরুষ নির্যাতনের মামলা ঠুকে দিত। ভাগ্যিস আমাদের দেশে এরকম কোনো আইন নেই!

তিস্তার বাবা কলকাতা ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট। আর মা ছোটবেলাতেই গত হয়েছেন। বাড়ির লোক বলতে বাপ বেটি আর একজন কাজের লোক। বাবা সময় দিতে পারে না বলে তিস্তার সমস্ত আদর আবদার আমার কাছে। আমিও চেষ্টা করি সাধ্যমতো পূরণ করার।আমি জানি একরোখা,জেদী , বদমেজাজি মেয়েটার মধ্যে একটা বাচ্চা মেয়ে লুকিয়ে আছে যে একটুতেই খিলখিল করে হেসে ওঠে আবার সামান্য কারণেই অভিমান করে।

আরও দেখুনঃ 100+ Best Bengali Status For Facebook & WhatsApp


” কি বুঝবো!! আমাকে তুমি বোঝাচ্ছ! প্রেমিকরা তাদের প্রেমিকার জন্য কত কিছু করতে পারে, আর তুমি আমার জন্য যাদবপুর থেকে বালিগঞ্জ আসতে পারো না?”

আবার সেই লিমকার ঝাঁজ! সত্যি বাপ কা বেটি! যার বাপ অমন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার তার মেয়ে তো এমন হবেই। উফফ কি ভুল করে এমন এক মেয়ের প্রেমে পড়েছিলাম!
চুপ করে আছি দেখে আমার ঝাঁঝিয়ে উঠল তিস্তা,” কি হলো? “

আমি আমতা আমতা করে বললাম,” এই লকডাউনে তোমার বাড়ি গিয়ে কি করব?”
” এ কে রে! বোকা না হাঁদা! কিচ্ছু বোঝে না নাকি! দুজনে মিলে গুপি গাইন বাঘা বাইন দেখবো তাই তোমাকে ডাকছি! বাড়িতে কেউ নেই তাই আসার কথা বললাম, যাতে একসাথে কিছুটা সময় কাটানো যায়, আর উনি ন্যাকামি করে জিজ্ঞেস করছেন কি করব তোমার বাড়ি গিয়ে!”

রাসবিহারী মোড়,লেক মার্কেট পেরিয়ে দেশপ্রিয় পার্কের সিগন্যালে এসে পুলিশ আটকালো। বাইক থামিয়ে একধারে দাঁড়ালাম। লকডাউনের জন্য নাকাচেকিং চলছে। উপযুক্ত কারণ দেখাতে পারলে তবেই মিলবে যাওয়ার ছাড়পত্র। কি কারণ দেখাবো আমি??

একজন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলেন আমার দিকে। ছয় ফুটের ওপর হাইট। চওড়া গোঁফ, আর সামনে গ্যাস বেলুন সাইজের একটা ভুঁড়ি।

” কোথায় যাওয়া হবে? কি দরকারে?”

কি জবাব দেব বুঝতে না পেরে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

” কি হল? কথা কানে যাচ্ছে না?” আ..আ..আমি আসলে…”

” তুমি আসলে কি? পেছনপাকা ছেলে? সে তো দেখেই বোঝা যাচ্ছে।”

মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম শুধু। গলা শুকিয়ে আসছে আমার।

এবার পুলিশ অফিসারটির সুর সামান্য নরম হল। মোলায়েম গলায় বলল,” লুক ইয়ংম্যান..তোমরা স্মার্ট,ইন্টেলিজেন্ট। নিশ্চই বুঝতে পারছ পরিস্থিতি কতটা খারাপ। এভাবে হুটহাট বেরিয়ে পড়লে চলবে? “

একটু আগেই যিনি মহিষাসুরের মত বজ্রগম্ভীর গলায় কথা বলেছিলেন তিনি যে এমন মোলায়েম গলাতেও কথা বলতে পারেন এ আমার কল্পনাতীত।

সাহস পেয়ে বললাম,” বেরোতাম না স্যার। আসলে প্রেমিকা আমার ভারী অভিমানী। লকডাউনে প্রায় দুমাস হল দেখা হয়নি। যেটুকু দেখতে পাই ওই ভিডিও কল এর দৌলতে। তাতে কি আর মন ভরে? জানেন ওর বাবাও আপনার মতই পুলিশ অফিসার। একটুও সময় দিতে পারেন না মেয়েকে। ফলে ওর সব আদর,আবদার ,ভালো লাগা ,খারাপ লাগা আমাকে ঘিরেই। আর আমিও প্রশ্রয় দিই। কি করব বলুন! ভালো না বেসে থাকতে পারি না যে।”

পুলিশ অফিসারটি কিছুক্ষন চুপ করে রইলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন,” কি নাম তোমার প্রেমিকার?”

” তিস্তা স্যার।”

কিছুক্ষন চুপ করে থাকলেন তিনি। তারপর আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন,” তোমার মত বয়সে আমিও একটা মেয়েকে ভালোবেসেছিলাম। মাধবী নাম। খুব ভালো গান গাইতো। বলতে পারো গান শুনেই ওকে ভালো লেগেছিল আমার। তারপর ছ বছরের সম্পর্কে অনেক ঝড়ঝাপটা এসেছিল। আমরা কিন্তু পিছু হটিনি।

আসলে বেকার ছিলাম বলে মাধবীর বাবা কিছুতেই সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছিলেন না। বাধ্য হয়ে পালিয়ে বিয়ে করেছিলাম আমরা। চারটে টিউশন পড়ানোর টাকায় কোনক্রমে চলে যেত। স্বাচ্ছন্দ্য ছিল না হয়ত,কিন্তু সুখ ছিল। মাধবী অবশ্য আমার বেকারত্ব নিয়ে কোনোদিন কিছু অভিযোগ করেনি।

সব কিছু দেখে শুনেই ও ঘর ছেড়ে এসেছিল। এর প্রায় দুবছর পর কলকাতা পুলিশে চাকরি পেলাম আমি। খুব খুশি হয়েছিল মাধবী। আমিও ভেবেছিলাম ভগবান বুঝি এবার মুখ ফিরে চাইলেন। তারপর কোল আলো করে তিস্তা এল। সবকিছুই বেশ মসৃণ ভাবে চলছিল। তখনও বুঝতে পারিনি অদৃষ্ট হাসছেন আড়াল থেকে।

তিস্তা জন্মানোর এক বছর পর ক্যান্সার ধরা পড়ল মাধবীর। লাস্ট স্টেজ।কিছুই করতে পারিনি আমি। আমার একরত্তি মেয়েটা মাতৃহারা হল। তারপর থেকে তিস্তাকে একা নিজের হাতে মানুষ করেছি আমি। জানি,মা এর মত স্নেহ ভালোবাসা,যত্ন কোনোটাই দিতে পারিনি আমি। মায়ের সোহাগ পায়নি বলেই হয়ত আমার মেয়েটা ভালোবাসার কাঙাল। তুমি ওর একটু খেয়াল রেখো আর যত্ন নিয়ো। কি….পারবে না ইয়ংম্যান?”

আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম শুধু। যার সামনে দাড়িয়ে আছি ইনিই তিস্তার বাবা! এমন কাকতালীয় ঘটনা যে ঘটতে পারে এ আমার কল্পনারও বাইরে।

তিনি বললেন,” তুমি ভালোবাসো আমার মেয়েকে,খুব ভালো কথা। ওকে ভালো রাখার দায়িত্ত্ব কিন্তু তোমার। ছেলেমানুষী আবদারগুলো কিন্তু তোমাকেই মেটাতে হবে। পারবে না..?”
বলে চেপে ধরলেন আমার দুটো হাত। ভদ্রলোকের গলায় আকুতি প্রকট।

আমি মৃদু হেসে আশ্বাস দিলাম,” পারব কাকু।”

বালিগঞ্জে তিস্তাদের অ্যাপার্টমেন্টে যখন পৌঁছলাম তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। বেল দিতে তিস্তা দরজা খুলল।

” আমি ভাবলাম বুঝি ভ্যানিশ হয়ে গেলে। যাদবপুর থেকে বালিগঞ্জ আসতে কারো দু ঘণ্টা লাগে!”

মুচকি হেসে বললাম,” শশুরমশাই এর সাথে দেখা হয়ে গেল। তাই একটু গল্পগুজব করছিলাম।”

” শ্বশুরমশাই? মানে? কিভাবে?”

সংক্ষেপে বললাম পুরো ঘটনাটা। পুরোটা শোনার পর হাততালি দিয়ে উঠল তিস্তা।
” উফফ!! কামাল করে দিয়েছ ! লাভ ইউ ইয়ার।”

আমি মৃদু হাসলাম শুধু।

তিস্তা অস্ফুটে বলল,”এতদিন অসোনি কেন? জানোনা কষ্ট হয় তোমাকে ছাড়া থাকতে?”
জল টলমল করছে ওর ডাগর চোখ দুটোতে।

তিস্তার আরো কাছে সরে হাত রাখলাম ওর গালদুটোতে। একটা বুনোফুলের মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছি আমি। দেখলাম ওর ঠোঁট দুটো কাঁপছে। রক্তজবার পাপড়ির মত ঠোঁটদুটো!

 

বাংলা গল্প : লকডাউনে প্রেম(2020)

হঠাৎ এক ঝটকায় আমাকে ফেলে দিল তিস্তা। তারপর পাহাড়ি নদীর উচ্ছল ঢেউ এর মত আছড়ে পড়ল আমার বুকে। ঢেউ এর দোলায় তিরতির করে কাঁপছে আমার শরীরটা।

রক্তজবার পাঁপড়ি দুটো নেমে এল আমার ঠোঁটে। তিস্তার গরম নিশ্বাসের হল্কায় যেন ঝলসে যাচ্ছে আমার সারা শরীরটা। যেন গরম ম্যাগমার স্রোত নেমে আসছে আমার শরীর বেয়ে। সাড়া দিলাম আমিও। মুখ ডোবালাম ওর মোমের মত মসৃণ গলায়।

তিস্তার ঢেউ সামলাতে পারছি না আমি। স্পষ্ট বুঝতে পারছি বাঁধ ভাঙবে এবার। মনের মধ্যে কেউ যেন আনমনে গেয়েই চলেছে,” আজ তিস্তা নদীর জলের ঢেউয়ে ছলাত ছলাত করে এমন ঝিলিক ঝিলিক ভাসে এ মন কিনারায়।”

(এই গল্পে ব্যাবহৃত সমস্ত চরিত্র ও ঘটনাবলী সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং লেখকের কল্পনাপ্রসূত)

বাংলা গল্প : লকডাউনে প্রেম
বাংলা গল্প,বাংলা গল্প,বাংলা,বাংলা গল্প,বাংলা গল্প, Love Story

https://pixabay.com

https://bengalilife.com

Leave a Comment